গণপূর্তের ই/এম সার্কেল-৩-কে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম, প্রশাসনিক প্রভাব ও স্বচ্ছতা নিয়ে উঠছে বহুমাত্রিক প্রশ্ন; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
১৭ কোটি টাকার বিল অনুমোদন, টেন্ডার ব্যবস্থাপনা ও সম্পদের উৎস নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে মাহবুবুল হক চৌধুরীর
- আপডেট সময় : ০৩:৫২:৫৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
- / 6
নিজস্ব প্রতিবেদক:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল-৩-কে ঘিরে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিপুল অঙ্কের বিল অনুমোদন, টেন্ডার ব্যবস্থাপনায় কথিত অনিয়ম, সম্পদের উৎস এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারসংক্রান্ত নানা অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সার্কেলটির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল হক চৌধুরীর। যদিও উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্তে চূড়ান্ত সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবুও বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক সংশ্লিষ্ট সূত্র, অভিযোগকারী এবং ঠিকাদারদের দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে সার্কেল-৩-এর অধীন বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক সিদ্ধান্ত একটি নির্দিষ্ট প্রভাববলয়ের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার আহ্বান থেকে শুরু করে দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান, সরঞ্জাম সরবরাহ, বিল যাচাই-বাছাই, অর্থ ছাড় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধাপে একই প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য ছিল।
এর ফলে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক যোগ্য ঠিকাদার সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগের অন্যতম আলোচিত বিষয় একটি সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ১৭ কোটি ৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৪৪ টাকার বিল অনুমোদন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি, মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজের পরিমাণ এবং অনুমোদিত বিলের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, প্রকল্পের সব কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিপুল অঙ্কের বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
সরকারি প্রকল্পে বিল অনুমোদনের আগে কাজের অগ্রগতি, প্রকৌশলগত মূল্যায়ন, পরিমাপ, গুণগত মান, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং বিদ্যমান সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অভিযোগকারীদের মতে, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
টেন্ডার ব্যবস্থাপনাকে ঘিরেও একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সার্কেল-৩-এর আওতাধীন বিভিন্ন প্রকল্পে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী বলয় সক্রিয় ছিল, যারা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে কিছু নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর ফলে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা,
প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন। যদিও এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।
এদিকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল হক চৌধুরীর সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট, পশ্চিম আগারগাঁও এলাকায় একটি চারতলা ভবন এবং বনশ্রী-আমুলিয়া এলাকায় জমিসহ আরও কয়েকটি মূল্যবান স্থাবর সম্পদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের বক্তব্য, সরকারি চাকরির স্বাভাবিক আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা রাষ্ট্রীয় সংস্থার মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত। তবে এসব সম্পদের মালিকানা, মূল্য কিংবা অর্থের উৎস সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি এবং অভিযোগগুলোও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, ঠিকাদার আলাউদ্দিন ওয়াজেদ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযোগপত্রে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, বিল অনুমোদন, সরঞ্জাম ক্রয়, অর্থ পরিশোধ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। তবে অভিযোগটি বর্তমানে প্রাথমিক যাচাই পর্যায়ে রয়েছে এবং এ বিষয়ে দুদক এখনো কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেনি।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নানা পরিবর্তনের পরও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রভাববলয় বহাল রয়েছে। তাদের অভিযোগ, অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা, তথ্য সংগ্রহ করা কিংবা সংবাদ প্রকাশের উদ্যোগ নিলে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়। তবে এসব অভিযোগও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্য কিংবা সরকারি প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রথমে প্রাথমিক যাচাই করা হয়। সেই যাচাইয়ে অভিযোগের ভিত্তি পাওয়া গেলে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবুল হক চৌধুরীর বক্তব্য জানতে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। ভবিষ্যতে তিনি বক্তব্য প্রদান করলে তা যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
জননীতি, সুশাসন ও অবকাঠামো খাতের বিশ্লেষকদের মতে, জনগণের করের অর্থে পরিচা















