গণপূর্তের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনিরুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়: কাজ না করেই বিল উত্তোলন, টেন্ডার বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট তথ্য দুদকে।
- আপডেট সময় : ০১:৪৩:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
- / 81
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১ এর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সীমাহীন অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য এবং ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমানে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন।
এমনকি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ১০ মাস পার হলেও এই কর্মকর্তার অধীনস্থ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামেনি বলে জানা গেছে। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি বিস্তারিত আবেদন দাখিল করেছেন সচেতন নাগরিক ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত জুন মাসে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম সানাউল্লাহ’র মাধ্যমে নিজের পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ওটিএম (OTM) পদ্ধতিতে বেশ কিছু কাজ পাইয়ে দেন মনিরুল ইসলাম। দরপত্রের নিয়ম অনুযায়ী কাজের অগ্রগতি (Physical Progress) দেখে বিল পরিশোধের নিয়ম থাকলেও, ক্ষমতার অপব্যবহার করে কাজ সমাপ্ত হওয়ার আগেই সম্পূর্ণ বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।
দুদকে জমা পড়া নথিসূত্রে এই দুর্নীতির সাথে জড়িত ৩০টি সুনির্দিষ্ট ই-জিপি (e-GP) টেন্ডার আইডি পাওয়া গেছে। আইডিগুলো হলো: 997828, 997827, 997826, 997825, 995647, 994880, 995463, 995464, 995465, 995466, 995467, 994879, 995488, 995489, 995490, 995491, 995492, 995493, 994850, 994851, 995148, 994647, 994646, 994817, 994818, 994480, 994598, 994629, 994625, এবং 994626। ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের অভিযোগ, এই আইডিগুলোর বিপরীতে কোনো বাস্তব কাজ না করেই শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
অনুরূপ অনিয়মের চিত্র মিলেছে ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগেও। সেখানকার নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আবুল কালাম আজাদের সহযোগিতায় ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার (APP) নিয়ম নীতি লঙ্ঘন করা হয়েছে। যেসব কাজ এলটিএম (LTM) পদ্ধতিতে হওয়ার কথা ছিল, তা প্রভাব খাটিয়ে ওটিএম (OTM) পদ্ধতিতে রূপান্তর করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল নিজস্ব সিন্ডিকেটের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া।
গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪ ও ১ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে মোট ২৬টি বিতর্কিত দরপত্র আহ্বান করা হয়, যার আইডিগুলো হলো: 1056148, 1057945, 1056137, 1056138, 1056145, 1057947, 1058083, 1058073, 1058114, 1029437, 1057926, 1058123, 1057924, 1055520, 1055521, 1055522, 1055517, 1055518, 1055519, 1028014, 1057196, 1056074, 1056075, 1056073, 1057101, এবং 1018075। এই টেন্ডারগুলোর মাধ্যমেও সরকারের বিপুল অর্থ লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনিরুল ইসলামের দুর্নীতির হাত থেকে রক্ষা পায়নি গণপূর্তের আর্বোরিকালচার (বৃক্ষপালন) বিভাগও। অভিযোগ রয়েছে, এই বিভাগের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ শেখ মো. কুদরত-ই খুদাকে ব্যবহার করে নামমাত্র বা গোপন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অনিয়ম, ফুলগাছ লাগানোর নামে ভুয়া ভাউচার তৈরি, রাতের আঁধারে মূল্যবান গাছ ও গাড়ি বিক্রি এবং এমনকি সরকারি ফুলের বাগানে নিয়মবহির্ভূতভাবে ছাগলের খামার স্থাপন করে কোটি কোটি টাকা পকেটে ভরেছেন এই কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং তাঁর ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন মনিরুল ইসলাম। তৎকালীন বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের প্রভাবশালী নেতা হওয়ার সুবাদে বিগত ১০ বছরে বদলি বাণিজ্য ও টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে তিনি অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। এই চক্রে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলামও জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে মনিরুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের নামে অবিশ্বাস্য সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির খোঁজ পাওয়া গেছে। রাজধানীর মিরপুরে রয়েছে একটি বহুতল ভবনসহ শহরের বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় একাধিক বিলাসভহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক জমি। গ্রামের বাড়িতে নিজের স্ত্রীর নামে কিনেছেন কয়েকশত বিঘা ফসলি জমি।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি হ্যারিয়ার ও লেক্সাসের মতো ব্র্যান্ড নিউ বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করেন। শুধু তাই নয়, তদন্ত এড়াতে নিজের স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা জমা রাখার পাশাপাশি একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বড় অঙ্কের এফডিআর (FDR) করে রেখেছেন। এই বিপুল অর্থের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গণপূর্তের সার্কেল-১ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কিছু টেন্ডার আইডি এবং নথিপত্রসহ একটি লিখিত অভিযোগ আমরা পেয়েছি। কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী এটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। সত্যতা পাওয়া গেলে অতি দ্রুত আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করা হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলামের দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।













