ঢাকা ০৩:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo কুমিল্লায় ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা নারীকে ধর্ষণ, সিসিটিভি ফুটেজ ভাইরাল Logo রেমিট্যান্সে রেকর্ড, অর্থবছরে এলো ৩৫.৫৬ বিলিয়ন ডলার Logo রাজধানীতে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার Logo সচিবালয়ের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে! সাংবাদিকতার আড়ালে আ’লীগ নেতার চাঁদাবাজি ও ‘গুপ্তচরবৃত্তির’ চাঞ্চল্যকর অভিযোগ Logo ঢাবি শিক্ষার্থী ও তার মা-বোনকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে নিহত সন্দেহভাজন Logo গণপূর্তের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনিরুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়: কাজ না করেই বিল উত্তোলন, টেন্ডার বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট তথ্য দুদকে। Logo ইনুর রায় ৩০ জুন, সর্বোচ্চ শাস্তির প্রত্যাশা: চিফ প্রসিকিউটর Logo এবার নিজ নামে বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের Logo ৮নং জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে সিরাজুল ইসলামকে পেতে চায় ইউনিয়নবাসী Logo ৬নং ফতেহাবাদ ইউনিয়নকে একটি আধুনিক ও স্মার্ট ইউনিয়ন হিসাবে গড়তে চান চেয়ারম্যান প্রার্থী…..জসিম উদ্দিন শান্ত

চান্দিনায় ভিডিও ধারণে দুই সাংবাদিকের হাতে হাতকড়া: ক্ষমতার অপব্যবহার নাকি আইনি কঠোরতা?

Desk News
  • আপডেট সময় : ১১:০০:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬
  • / 192
cumillapost অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মো: তোফায়েল আহমেদ

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় দুই সাংবাদিককে হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠানোর ঘটনাটি এখন শুধু একটি স্থানীয় ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি রীতিমতো প্রশাসনিক আচরণ, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং আইনের প্রয়োগ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বুধবার (১ এপ্রিল) দুপুরে চান্দিনা উপজেলা ভূমি অফিসে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সাংবাদিক মহলে চলছে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা।

অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নূরের দপ্তরে ভিডিও ধারণ করাকে কেন্দ্র করে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার দেবিদ্বার প্রতিনিধি রাসেল সরকার এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল ফেস দ্য পিপল-এর প্রতিনিধি আব্দুল আলীমকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠানো হয়। শুধু তাই নয়, পরে থানায় নিয়ে তাদের মোবাইল ফোন থেকে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগও উঠেছে, যা ঘটনাটিকে আরও বেশি বিতর্কিত করে তুলেছে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিক আব্দুল আলীম জানান, তার খালাতো বোনের একটি নামজারি সংক্রান্ত বিষয় প্রায় এক বছর ধরে ঝুলে ছিল। নির্ধারিত শুনানির দিন উপস্থিত থাকতে তিনি সহকর্মী রাসেল সরকারকে সঙ্গে নিয়ে ভূমি অফিসে যান। শুনানির বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এ সময় সেই আচরণ মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নেয়।

সাংবাদিকদের দাবি, ভিডিও ধারণ করতে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে কর্মকর্তা তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে বাধা দিলে পুলিশ ডেকে এনে তাদের হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে থানায় নিয়ে গিয়ে হাতকড়া পরা অবস্থায় মোবাইলের লক খুলে গ্যালারিতে থাকা ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলা হয় বলেও অভিযোগ করেন আব্দুল আলীম। সবশেষে, বিষয়টি আর না বাড়ানোর শর্তে তাদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নূর দাবি করেন, তার দপ্তরে অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার কারণেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ দায়িত্ব পালন করেছে, এতে তাদের নিজস্ব কোনো ভূমিকা ছিল না।

ঘটনার পরপরই দুই সাংবাদিকের হাতকড়া পরা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী এনামুল হক ফারুক এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাংবাদিকরা সমাজের বিবেক এবং তাদের কাজ করতে গিয়ে ভুল হলে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এভাবে হাতকড়া পরানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি সাংবাদিক সমাজের জন্য অপমানজনক।

এ বিষয়ে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং তারা বিষয়টি নিয়ে বিব্রত। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

ঘটনাটি সামনে এনে দিয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সরকারি দপ্তরে ভিডিও ধারণ কি সত্যিই অপরাধ ছিল, নাকি তা ছিল সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের অংশ? প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগে কি সীমা অতিক্রম করা হয়েছে? থানায় নিয়ে মোবাইলের তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ কতটা সত্য? এবং মুচলেকা নেওয়ার পেছনে কোনো চাপ ছিল কি না?

সবকিছু মিলিয়ে চান্দিনার এই ঘটনা প্রশাসন ও গণমাধ্যমের সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর দিককে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব, অন্যদিকে সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় না থাকলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হয় কি না এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

চান্দিনায় ভিডিও ধারণে দুই সাংবাদিকের হাতে হাতকড়া: ক্ষমতার অপব্যবহার নাকি আইনি কঠোরতা?

আপডেট সময় : ১১:০০:৫৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ এপ্রিল ২০২৬

মো: তোফায়েল আহমেদ

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলায় দুই সাংবাদিককে হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠানোর ঘটনাটি এখন শুধু একটি স্থানীয় ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এটি রীতিমতো প্রশাসনিক আচরণ, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং আইনের প্রয়োগ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বুধবার (১ এপ্রিল) দুপুরে চান্দিনা উপজেলা ভূমি অফিসে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সাংবাদিক মহলে চলছে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা।

অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নূরের দপ্তরে ভিডিও ধারণ করাকে কেন্দ্র করে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার দেবিদ্বার প্রতিনিধি রাসেল সরকার এবং অনলাইন নিউজ পোর্টাল ফেস দ্য পিপল-এর প্রতিনিধি আব্দুল আলীমকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠানো হয়। শুধু তাই নয়, পরে থানায় নিয়ে তাদের মোবাইল ফোন থেকে ধারণ করা ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলার অভিযোগও উঠেছে, যা ঘটনাটিকে আরও বেশি বিতর্কিত করে তুলেছে।

ভুক্তভোগী সাংবাদিক আব্দুল আলীম জানান, তার খালাতো বোনের একটি নামজারি সংক্রান্ত বিষয় প্রায় এক বছর ধরে ঝুলে ছিল। নির্ধারিত শুনানির দিন উপস্থিত থাকতে তিনি সহকর্মী রাসেল সরকারকে সঙ্গে নিয়ে ভূমি অফিসে যান। শুনানির বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী কমিশনার (ভূমি) হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এ সময় সেই আচরণ মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে মোড় নেয়।

সাংবাদিকদের দাবি, ভিডিও ধারণ করতে দেখে ক্ষিপ্ত হয়ে কর্মকর্তা তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে বাধা দিলে পুলিশ ডেকে এনে তাদের হাতকড়া পরিয়ে থানায় পাঠানোর নির্দেশ দেন। পরে থানায় নিয়ে গিয়ে হাতকড়া পরা অবস্থায় মোবাইলের লক খুলে গ্যালারিতে থাকা ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলা হয় বলেও অভিযোগ করেন আব্দুল আলীম। সবশেষে, বিষয়টি আর না বাড়ানোর শর্তে তাদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফয়সাল আল নূর দাবি করেন, তার দপ্তরে অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার কারণেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান বলেন, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে পুলিশ দায়িত্ব পালন করেছে, এতে তাদের নিজস্ব কোনো ভূমিকা ছিল না।

ঘটনার পরপরই দুই সাংবাদিকের হাতকড়া পরা একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী এনামুল হক ফারুক এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাংবাদিকরা সমাজের বিবেক এবং তাদের কাজ করতে গিয়ে ভুল হলে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এভাবে হাতকড়া পরানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি সাংবাদিক সমাজের জন্য অপমানজনক।

এ বিষয়ে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং তারা বিষয়টি নিয়ে বিব্রত। বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

ঘটনাটি সামনে এনে দিয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সরকারি দপ্তরে ভিডিও ধারণ কি সত্যিই অপরাধ ছিল, নাকি তা ছিল সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের অংশ? প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগে কি সীমা অতিক্রম করা হয়েছে? থানায় নিয়ে মোবাইলের তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগ কতটা সত্য? এবং মুচলেকা নেওয়ার পেছনে কোনো চাপ ছিল কি না?

সবকিছু মিলিয়ে চান্দিনার এই ঘটনা প্রশাসন ও গণমাধ্যমের সম্পর্কের একটি স্পর্শকাতর দিককে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব, অন্যদিকে সত্য তুলে ধরার দায়িত্ব—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় না থাকলে এমন ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের জন্ম দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হয় কি না এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না।